স্থুলশরীর, সূক্ষ্মশরীর, কারণশরীর এবং শুভশুভ কর্মের বিচিত্র গতি

বৈদিক আত্মতত্ত্বে দেখা যায়, জীবাত্মা ইহলোকের স্থুলশরীর ত্যাগ করার সময় সূক্ষ্মশরীর ও কারণশরীর(চৈতন্যশক্তি)কেও সাথে করে পরলোকে নিয়ে যায়। জীবের কর্মেন্দ্রিয় এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় নিয়ে হয় স্থুলশরীর, আর মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার বা আমিত্ব নিয়ে হয় সূক্ষ্মশরীর। জাগ্রত অবস্থায় তিন শরীরই কাজ করে, নিদ্রারত অবস্থায় স্বপ্ন দেখার সময় স্থুলশরীর কাজ করেনা, শুধু সূক্ষ্মশরীর ও কারণশরীর কাজ করে, এবং সুষুপ্তি বা ধ্যানের প্রগাঢ় অবস্থা সমাধিতে শুধুমাত্র কারণশরীর কাজ করে। মানবের পূর্বপূর্ব জন্মের কর্মফল এবং বর্তমান জন্মের কর্মফলও জীবাত্মা, সূক্ষ্মশরীর এবং কারণশরীরের সাথে বহন করে এবং সেই কর্মফলের উপর ভিত্তি করেই জীবাত্মা পরলোকে শুভাশুভ কর্মফল উপযুক্ত স্থানে ভোগ করে পুণরায় স্থুলশরীর ধারণ করে। অতীতের বহু জন্মের সঞ্চিত সকল কর্মফল ভোগ না হওয়া পর্যন্ত জীবাত্মার দুঃখময় ইহলোক বা ভোগময় জগত হতে অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তি মিলেনা। আবার পরলোকেও মানবের সকল শুভাশুভ কর্মের ভোগ হয়না। কারণ পরলোকে মানবের সকল শুভাশুভ কর্মফল ভোগ শেষ হয়ে গেলে তো জীবাত্মার পুণরায় ইহলোকে স্থুলদেহ ধারণ করার কোন কারণই থাকেনা। তাহলে তো শুধুমাত্র কর্মফল ভোগ দ্বারাই জীবাত্মার মোক্ষপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার কথা। সে হিসেবে তো জগতের সবচেয়ে জঘন্যতম পাপী ব্যক্তিও পরলোকে শাস্তি ভোগ করতে করতে একসময় পাপের কর্মফল শেষ হয়ে গেলে মোক্ষলাভ করে ফেলতে পারে! কারণ তার যে কোন সঞ্চিত কর্মফলই নেই আর। তাই তার পুণরায় স্থুলদেহ ধারণ করার কারণও নেই। তাই নয় কি? কিন্তু এরকমটা হবার সুযোগ নেই। কারণ স্থুলশরীর ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা যেসকল শুভাশুভ কর্ম করে, সূক্ষ্মশরীর সেসকল কর্মসংস্কার, প্রবৃত্তি বা স্বভাবও কর্মফলের সাথে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ফলে সূক্ষ্মশরীর পরকালে শুভাশুভ কর্ম কিছুটা ভোগ করার পরে তার সেই কর্মসংস্কার, স্বভাব বা প্রবৃত্তি অনুযায়ী পুণরায় ইহলোকে যথাযথ স্থুলশরীর ধারণ করার জন্য উদগ্রীব হয় এবং তার উপযুক্ত স্থান, কাল, পাত্র ও পরিবেশ পেলে কারণ শরীরসহ জীবাত্মার শক্তিতে পুণরায় ইহলোকে স্থুলশরীর ধারণ করে।

বর্তমান জন্মের স্থুলশরীর কেমন হবে, ভাগ্য কেমন হবে সেটা পূর্বপূর্ব জন্মের সঞ্চিত কর্মফল বা প্রারব্ধ দ্বারাই নির্ধারিত হয়। তাই মানবশিশু জন্মান্ধ হলে বা পাপকাজ শেখার আগেই অন্ধ হয়ে গেলে, দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে আমরণ নিদারুণ দুঃখকষ্ট ভোগ করলে, দুর্ভিক্ষে অনাহারে শিশু ক্রমাগত মৃত্যুর মুখে এগিয়ে চললে বিধাতার কাছে এটা বলে জবাবদিহিতা চাওয়ার কোন উপায় নেই যে, কেন একজন ব্যক্তি রাজার ঘরে জন্ম নিয়ে দিব্যি মহাসুখে আছে আর আরেকজন পাপকাজ শেখার আগেই আমরণ দুঃখকষ্ট ভোগের পথে এগিয়ে চলছে? প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ কর্মফলই ভোগ করে, আর বিধাতাও পক্ষপাতমুক্ত। তাই তাঁর ইচ্ছামতো কাওকে তিনি সুখে রাখবেন আর কাওকে তিনি দুখে রাখবেন, এমন পক্ষপাত তিঁনি কখনোই করেন না। তাঁর কাছে সকলেই সমান। কারণ সকলেই যে তাঁরই সৃষ্টি। প্রত্যেকে যার যার কর্মফল দ্বারা সুখ-দুঃখ ভোগ দ্বারা বৈষম্য অনুভুত হওয়ায় বিধাতাকে পক্ষপাতযুক্ত মনে হয়। আসলে মোটেও বিধাতা পক্ষপাতী নয়।

আবার দুঃখকষ্ট দিয়ে বিধাতা মানবকে যে পরীক্ষা করেন বলে ধারণা আছে, সেই পরীক্ষার ভিত্তিও মানবের নিজ নিজ কর্মফলই। বিধাতা শুধু মানবের শুভাশুভ কর্মফল অনুযায়ী সুখ-দুঃখের পরিস্থিতি মানবের সামনে হাজির করেন মাত্র। আর সেটাকেই আমাদের কাছে মনে হয় যে, বিধাতা বুঝি আমাদেরকে পরীক্ষা করছেন। বস্তুত আমাদের করা পাপ-পুণ্যই আমাদের কাছে যথাক্রমে দুঃখ এবং সুখরূপে এসে হাজির হয়। তাছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সকল পরীক্ষার্ত্রীর জন্য একই হয়। একজনকে জন্মান্ধ করে পরীক্ষা করা, আরেকজনকে দুর্ভিক্ষে অনাহারে না খাইয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যু দ্বারা, আরেকজনকে আজীবন পঙ্গুত্ব দ্বারা দুঃখকষ্ট ভোগ করা ইত্যাদি কখনো একই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হতে পারেনা, অন্তত নিরপেক্ষ পরীক্ষকের কাছে।

যে বিষয়টি তুলে ধরার জন্য উপরোক্ত ভূমিকাটি বিশদভাবে বলতে হলো, সেটা হচ্ছে, স্থুলশরীর ও সূক্ষ্মশরীরের দ্বারা কৃত কর্মের মধ্যে সম্পর্ক, সমন্বয় ও পরিণতি বোঝানো। স্থুলশরীর অর্থাৎ কর্মেন্দ্রিয় (হাত, পা, মুখ, উপস্থ ও পায়ু) এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক) দ্বারা কর্ম করার সময় সূক্ষ্মশরীরও (মন, বুদ্ধি ও অহং বা আমিত্ব) কাজ করে। কখনো কখনো স্থুলশরীর ও সূক্ষ্মশরীরের কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকে, কখনো থাকেনা। উদাহরণস্বরূপ, যখন স্থুলশরীর দ্বারা কোন ভালো কাজের পিছনে সূক্ষ্মশরীরের কোন অসৎ উদ্দেশ্য থাকে তখন স্থুল ও সূক্ষ্মশরীরের কাজে সমন্বয় থাকে না। কারণ উভয়ের কর্মের ধরণ বিপরীতমুখী, স্থুলশরীরের কর্মের উদ্দেশ্য শুভ এবং সূক্ষ্মশরীরের উদ্দেশ্য অশুভ। তখন মানব স্থুলশরীর দ্বারা কৃত শুভকর্মের ফল ঠিকই শুভ হয় এবং স্থুলশরীর ত্যাগ করার সময় সেই শুভ ফল বহন করার পাশাপাশি জীবাত্মা তার সূক্ষ্মশরীরে তার সেই অশুভ উদ্দেশ্য বা পাপটুকুও বহন করে নিয়ে যায়। সূক্ষ্মশরীর পরলোকে স্থুলশরীরের উপরোক্ত আপাত শুভকর্মফল ভোগ করলেও সূক্ষ্মশরীরের দ্বারা সেই কৃত পাপকর্মফলের শাস্তিও ভোগ করে। কিন্তু স্থুলশরীরের চেয়ে সূক্ষ্মশরীরের শক্তি বহুগুণে বেশি বলে জীবের স্বভাব বা প্রবৃত্তি স্থুলশরীরের দ্বারা কৃত শুভাশুভ কর্মফলের চেয়ে সূক্ষ্মশরীরের অর্থাৎ মন, বুদ্ধি ও অহং-এর দ্বারা কৃত কর্মফলের উপর বেশি নির্ভর করে। তাই উপরোক্ত ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি ইহকালে বাহ্যেন্দ্রিয় দ্বারা শুভকাজ করে কিন্তু মন, বুদ্ধি দ্বারা হীন চিন্তা করে, তার দ্বারা যদি ইহলোকে তেমন কোন পাপকাজ নাও হয়, তাতেও পরলোকে তার তেমন একটা সদ্গতি হলেও কিছু কর্মফল ভোগ শেষে সে তার সূক্ষ্মশরীরের স্বভাব বা সংস্কার অনুযায়ী পুণরায় হীন স্বভাবযুক্ত একটা দেহ লাভ করে এবং পুণরায় স্বভাব অনুযায়ী শুভাশুভ কর্ম করতে থাকে। স্থুলশরীরের চেয়ে সূক্ষ্মশরীর অধিকতর শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ বলেই শৈশব হতে সন্তানের মনে সর্বদা পরহিত, অপরের ভালো করার চিন্তা করার অভ্যাস করার শিক্ষা দেয়া উচিত। তাতে করে মানবের সূক্ষ্মশরীর ধীরে ধীরে শুদ্ধ হতে থাকে। আর সূক্ষ্মশরীর স্থুলশরীরের নিয়ন্ত্রক বলে সূক্ষ্মশরীর শুদ্ধ হলে স্থুলশরীরও শুদ্ধ হতে বাধ্য হয়। কিন্তু স্থুলশরীর দ্বারা কৃত কর্মশুদ্ধ হলেও সূক্ষ্মশরীর শুদ্ধ নাও হতে পারে।

ব্যবহারিক জীবনেও দেখা যায়, অনেক ছলব্যক্তি বাহ্যে হাজারটা ভালো কাজ করে কিন্তু সেসবের পিছনে অনেক অশুভ উদ্দেশ্য বিদ্যমান এবং কর্তার মন ও বুদ্ধি জিলিপির প্যাঁচে ভরা। এধরণের ব্যক্তির ইহকাল ও পরকাল, কোন কালেই সদ্গতি হয়না। আরেকটি উদাহরণ দেই। কিছু কিছু ধর্ম প্রচারক ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে স্বধর্মচ্যুত করে তার ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য সেই গরীব, অসহায়, বা নানা দুঃখকষ্টে জর্জরিত ব্যক্তিকে এমনভাবে আর্থিক, সামাজিক, মানবিক ইত্যাদি সাহায্য করতে থাকে যেন সেই ব্যক্তিটি তার স্বধর্ম হতে বিচ্যুত হয়ে ধর্মপ্রচারকের ধর্মমতে আকৃষ্ট হয়। এক্ষেত্রে ধর্মপ্রচারক তার স্থুলশরীর দ্বারা বেশ শুভকর্ম করলেও তার সূক্ষ্মশরীর যেহেতু নিকৃষ্ট প্রথা ধর্মান্তরকরণের লক্ষ্যে কাজ করেছে, সেহেতু তার কর্মগুলো মোটের উপর অশুভই হয়েছে। তাই অপরকে ধর্মচ্যুত করার উদ্দেশ্য এবং কাজের জন্য তার ইহকাল ও পরকালে কোথাও সদগতি হয়না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *