সিজারিয়ান সেকশন

সম্প্রতি একটা সমীক্ষায় নাকি দেখা গিয়েছে যে, আমাদের দেশে ৭৭% অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন করা হয় এবং ৯৫% বেসরকারি ক্লিনিকের আয়ের মূল উৎস সিজারিয়ান সেকশন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে শিক্ষানবিশ থাকা অবস্থায় স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগে প্রশিক্ষণ নেয়া অবস্থায় স্ব স্ব ইউনিটে রোগী ভর্তির পরবর্তী দিন সকালে শিক্ষা অধিবেশনে স্ব স্ব ইউনিট প্রধান অধ্যাপিকা তাদের অধীনস্থ চিকিৎসকদের যথেষ্ট বকাঝকা করতেন কিছু রোগীর সিজারিয়ান সেকশনের পিছনে কোন উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারায়। তবে যে কারণে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় সিজার করা হয়, তার পেছনে প্রধান কারণ লোকবলের অভাব। এটা চাক্ষুষ দেখেছি এবং অনুভব করেছি। এখানে চিকিৎসকের আর্থিক উৎকর্ষতা প্রাপ্তি বা অর্থপুঁজিবাদের বিকাশের কিছু নেই। কারণ সরকারি হাসপাতালে কোন অপারেশন চার্জই নেই। প্রসব বেদনা ওঠার পরে একটা স্বাভাবিক প্রসব হতে কখনো কখনো ২৪ ঘন্টা পর্যন্তও লাগে। সে হিসেবে রোগী ভর্তির দিনে এক প্রসবের রোগীর পিছনেই তিনবেলা তিনজন চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়। তাহলে ভর্তির দিনে অন্তঃবিভাগে শত শত রোগীর চিকিৎসা কে করবে!? ভর্তির দিনে সারাদিনে কমপক্ষে বিশজন রোগীর স্বাভাবিক প্রসব করাতে বিশজন মহিলা চিকিৎসকের প্রয়োজন ধরে নিলেও সারাদিনে অন্তঃবিভাগে চিকিৎসক পদায়িত থাকে মাত্র ৩*৬= ১৮ জন। তাহলে কি গাইনী বিভাগ সারাদিন স্বাভাবিক প্রসব নিয়েই পড়ে থাকবে? তাহলে জরুরী সিজারসহ অন্যান্য ধরণের স্ত্রীরোগের জরুরী চিকিৎসা কে দিবে? সেজন্য ঘন্টার পর ঘন্টা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য অপেক্ষা করে অন্য অনেক জটিল রোগীর পাশে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের পদ না থাকায় সময়ের হিসেবে অনেক দীর্ঘায়িত প্রসব শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই সিজারিয়ান সেকশন করা হয়।

এটা তো গেলো সরকারি হাসলাতালের কথা যেখানে প্রসবের রোগীকে সিজার করালে চিকিৎসকের কোন আর্থিক লাভ হয়না। বরং সিজার না করালেই তার লাভ, অনেকটা পরিশ্রম ও সময় বেঁচে যায়। তারপরেও উপরোক্ত কারণে বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসককে অপ্রয়োজনে সিজার করতে হয়। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে কেন এত বেশি সিজার করা হয়? সেখানে তো আর এত রোগীর চাপও নেই। তাহলে এর পিছনে কি কি কারণ আছে? একটু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সেখানে অপ্রয়োজনীয় সিজারের কারণগুলি। প্রথমত, ক্লিনিকগুলির আয়ের মূল উৎসই সিজার। তাই প্রসবের রোগীদেরকে ছলে-বলে-কৌশলে সিজারের দিকে নিয়ে যাওয়াই তাদের প্রধান কাজ। তাই চিকিৎসকের চেয়ে এ ব্যাপারে ক্লিনিক মালিকের ইচ্ছাই অপ্রয়োজনীয় সিজারের প্রতি বেশি থাকে। কারণ একটা সিজার করতে যদি মোট খরচ বিশ হাজার টাকা হয়, তাহলে ক্লিনিক মালিক নেয় সর্বনিম্ন পনেরো হাজার টাকা, চিকিৎসক পায় সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা। এসব ক্ষেত্রে ক্লিনিক মালিক রোগীকে বিভিন্ন ধরণের ভয় দেখায়; বাচ্চা পেটের ভিতর উল্টা হয়ে আছে, বাচ্চা নড়ে কম, গর্ভঝিল্লীর ভিতরে পানি কম, বাচ্চা পায়খানা করে দিয়েছে জরায়ুর ভিতর! ইত্যাদি ইত্যাদি। অনাগত সন্তানের মঙ্গলের জন্য নিজের জীবনকে পর্যন্ত ত্যাগ করতে প্রস্তুত গর্ভবতী মাতা যখন এসব শোনে, তখন অনেক ভয় পেয়ে বাধ্য হয়ে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর সিজার করতে রাজী হয়ে যায়। ক্লিনিক মালিক যখন শল্যবিদ প্রসূতিরোগ চিকিৎসককে জানায় যে, সিজার করতে হবে, রোগীর সম্মতি আছে, তখন সে এসে শুধু সিজার করে চলে যায়।

যদি সময় এবং পরিশ্রমের হিসেব করা হয়, তাহলে সিজার করতে সময় লাগে ২০-৪০ মিনিট এবং নরমাল ডেলিভারি করতে সময় লাগে কয়েক ঘন্টা থেকে বারো ঘন্টা পর্যন্ত এবং তাই স্বভাবতই তাতে পরিশ্রমও অনেক বেশি। যদি প্রসূতি সার্জন একটা সিজার করলে ৫-১০ হাজার টাকা পান, তাহলে একটা নরমাল ডেলিভারি করাতে তাকে কত টাকা দেয়া উচিত, সেটা পাঠকের উপরই ছেড়ে দিলাম।

আমাদের দেশে পরিকল্পিত গর্ভধারণ অত্যন্ত বিরল। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণের হারও বেশ কম। যে দেশে কিনা পত্নী পতিকে বলে, “হ্যা গা, তিন মাস ধরি রক্ত যায় না, পোয়াতি হয়ি গেলাম না তো!?”, সে দেশে পরিকল্পিত গর্ভধারণ তো দুরের কথা, সেদেশে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসাপরামর্শ গ্রহণও আশ্চর্য্যের বিষয় বৈ কি! তাই অপ্রয়োজনীয় সিজারের দ্বিতীয় কারণ, প্রসূতির নিজের অবহেলা। গর্ভাবস্থার পুরো নয় মাস দশ দিনে গর্ভবতী নারীকে কমপক্ষে তিনবার স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। সেটা নিকটস্থ সরকারি এবং বেসরকারি মা ও শিশু সেবা কেন্দ্র, থানা ও জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেকোন চিকিৎসাকেন্দ্রই হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক গর্ভবতী মহিলাই গর্ভবতী অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া তো দুরের কথা, যথাসময়ে প্রসব বেদনা উঠলেও হাসপাতালে প্রসব করতে যায় না! যখন গর্ভস্থ শিশুর মাথা ও দুই পা ধরে দাইয়ের টানাটানিতে মা ও শিশু উভয়েই বিরক্ত হয়, যখন সেই অতিবিরক্ত শিশু দাইয়ের হাত ধরে সুন্দর পৃথিবীতে ভুমিষ্ঠ হতে একেবারেই রাজী হয়না অথবা যখন মা ও শিশু উভয়ের প্রাণই ওষ্ঠাগত, তখন মধ্য আইকিউসম্পন্ন পরিবারের কোন সদস্য সেই অসম্পূর্ণ প্রসবযুক্ত গর্ভবতী নারীকে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যায়। আর তখন সিজার করা ছাড়া গত্যন্তর থাকেনা। তৃতীয় কারণটি অত্যন্ত যৌক্তিক, অনেক গর্ভবতী নারী নিয়মিত স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞের পরিচর্যায় থাকা সত্ত্বেও এবং পরিচর্যাহীন অনেকেরই প্রসবকালীন সময়ে বেশ জটিলতা হয়। তখন সিজার না করে কোন উপায়ই থাকেনা। চতুর্থ কারণ হিসেবে কিছু অনৈতিক চিকিৎসকের অর্থমোহকে স্বীকার করতেই হবে, নইলে একই পেশাজীবী বলে পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট হওয়াটা অবাক হবার মতো কিছু হবে না। তবে এ ধরণের চিকিৎসকের সংখ্যাটা অল্প।

অবশেষে সিজারের পঞ্চম ও ষষ্ঠ অতি নগন্য কারণ হিসেবে আমার ধারণার কথা বলবো যেটা পাঠকের কাছে হয়তো অত্যদ্ভুত ও খানিকটা অশ্লীল মনে হতে পারে। সেজন্য প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। অপ্রয়োজনীয় সিজারের পঞ্চম কারণ হলো, কিছু কিছু গর্ভবতী নারী প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে অনিচ্ছুক এবং অনেকে অযোগ্যও। সেজন্যই হয়তো তাদের অনেকেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেরাই চিকিৎসককে নরমাল ডেলিভারির পরিবর্তে সিজার করতে বলে! অপ্রয়োজনীয় সিজারের ষষ্ঠ কারণটি পতি-পত্নীর রতিসুখের সাথে সম্পর্কিত! যদিও নারীর যোনি যথেষ্ট সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত, তারপরেও পুরুষের শিশ্নের তুলনায় ব্যাসার্ধে অনেকগুণ বড় শিশুর পুরো দেহটি যখন নারীর যোনিদ্বার দিয়ে বের হয় তখন নারীর যোনিদ্বার বেশ বড় এবং শিথিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে পত্নীর সেই শিথিল ও বৃহৎ যোনিপথে রতিক্রিয়া করে পতি-পত্নী উভয়েই যথেষ্ট তৃপ্তিলাভ করেনা! সেজন্যই হয়তো অত্যন্ত রতিসুখসচেতন দম্পতি অপ্রয়োজনীয় সিজারের সিদ্ধান্ত নেয়! দাম্পত্যসম্পর্কে অনভিজ্ঞ লেখকের উপরোক্ত ধারণার কারণ মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন এবং শিক্ষানবিশ থাকার সময় অনেক মহিলা রোগীকে বৃহৎ ও শিথিল হয়ে যাওয়া যোনিপথকে সার্জারি করে সরু করার জন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কসমেটিক সার্জনের শরণাপন্ন হতে দেখেছি। স্ত্রীরোগ বহির্বিভাগে শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রশিক্ষণকালে এক মহিলা রোগীর অভিযোগ ছিল যে, তার স্বামী মারে। তাকে বললাম, এজন্য ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’এ গিয়ে অভিযোগ ও চিকিৎসা করাতে। কিন্তু সে মহিলাকে কে যেন নিশ্চিত করে বলেই দিয়েছে যে, তার চিকিৎসা এখানেই হবে। তখন খুব কৌতুহল হলো। তাকে বারবার জেরা করাতে অবশ্য সে বলতে বাধ্য হলো যে, তার যোনিপিথের ছিদ্র অনেক বড় ও ঢিলা হয়ে গিয়েছে, তার স্বামী রতিক্রিয়ার সময় তৃপ্তি পায়না। সেজন্যই স্বামী মারে। যোনিছিদ্র সরু করার অপারেশন করতেই সে এসেছে!

এত এত অপ্রয়োজনীয় সিজার হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্র যে অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না সেটার পিছনে কারণ কি? কখনো কখনো মনে হয়, রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝি একে ‘সিজারিয়ান বার্থ কন্ট্রোল’ হিসেবে মনে করে। কারণ প্রথম সন্তানটা সিজার দ্বারা ভূমিষ্ঠ হলে দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও প্রায় বাধ্যতামূলকভাবে সিজার করতে হয়। এরপর দম্পতি এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ উভয়েই সিদ্ধান্ত নেয়, তৃতীয় সিজার যেন না করতে হয়। ব্যস, দুই সন্তানের বেশি আর জন্মদান করা হয়না, সিজারিয়ান বার্থ কন্ট্রোল সম্পন্ন ও কার্যকর! তাই রাষ্ট্রযন্ত্রও এতে খুশি। অতএব অত্যধিক জনসংখ্যার ভারে ন্যুজ রাষ্টের কাছে অপ্রয়োজনীয় সিজার যেন বিপরীতে হিত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *