মানবকে দিয়ে পুণ্যের আশায় অতি সহজেই ভয়ঙ্কর পাপ করিয়ে নেয়া যায়। সেক্ষেত্রে অবশ্য তাকে মানব বলা যায়না; বড়জোর অন্ধবিশ্বাসী, অবিবেচক, মূর্খ, লোভী নররূপী দ্বিপদ পশু বলা যায়, পুণ্যের আশায় যাকে দিয়ে নৃশংসতম অপরাধও করিয়ে নেয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, কোন অজ্ঞানী, অন্ধবিশ্বাসী, মূর্খকে বলা হলো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কোন উপাসনালয়ে হামলা করতে। সে ব্যক্তি প্রথমত সামান্য বিবেকের বাধার কারণে সেই হীন কাজটি নাও করতে পারে। কিন্তু যখন তাকে এই হীনকাজের বিনিময়ে অশেষ পুণ্য এবং পরকালের সুখভোগের লোভ দেখানো হয়, তখন সে ব্যক্তি পুণ্যের আশায় সেই হীনকাজ তো বটেই, এমনকি বিধর্মীকে হনন করার মতো মহাপাপ করতেও কুন্ঠিত হয়না। কিন্তু বিবেকবান, যৌক্তিক, জ্ঞানী কোন ব্যক্তিকে একই হীনকাজ করতে বললে সে ব্যক্তি তার মানবীয়বোধ দ্বারাই সেকাজ করতে সরাসরি অস্বীকার করবে এবং যারা একাজ করতে যাচ্ছে তাদের বাধা দিবে। তাকে যদি উপরোক্ত কাজের বিনিময়ে পরকালের অশেষ পুণ্যের লোভও দেখানো হয়, এমনকি কেউ যদি এটাকে তার ধর্মমতের ঐশী আদেশ হিসেবে প্রমাণিতও করে, তাহলেও সে ব্যক্তি সেকাজ করা হতে বিরত হবে এবং সেই ঐশী আদেশের প্রতি সংশয়াপন্ন হবে। এরকমভাবেই বিভিন্ন ধরণের সংশয় হতেই আস্তিক ও নাস্তিক ভাবাপন্ন গোষ্ঠীর পাশাপাশি সংশয়বাদী নামক তৃতীয় গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। সংশয়বাদীগণ মানবতা, বিজ্ঞান, যুক্তি ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক বিভিন্ন ধর্মমতের ঐশী বিধি, আদেশগুলো নির্দ্বিধায় ত্যাগ করে কিন্তু কার্য্য-কারণবাদের নীতি অনুযায়ী বিশ্বব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা বলে একজনের অস্তিত্বকে মেনে নেয়, সেটাও সর্বদা নিশ্চয়তার সাথে নয়। কিন্তু সেই স্রষ্টা যে বিভিন্ন ধর্মমতের উল্লেখিত চরিত্রই, সেটা তারা প্রায়ই স্বীকার করেনা, বিশেষ করে যে ধর্মমতের স্রষ্টার বিভিন্ন বিধিনিষেধ যুক্তি, মানবতা, বিজ্ঞান ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাকে।

জগতে চার ধরণের আস্তিক পাওয়া যায়। এক শ্রেণীর আস্তিক ধনসম্পদ লাভ করার জন্য স্রষ্টাকে ডাকে, আরেক শ্রেণীর আস্তিক বিপদে পড়ে স্রষ্টাকে ডাকে। আরেক শ্রেণীর আস্তিক স্রষ্টাকে জানার জন্য চেষ্টা করে। তারা কখনোই যুক্তি, মানবতা ও বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই না করে কোন বিশ্বাসকেই গ্রহণ করেনা। এরাই সংশয়বাদী হয়। এরা কিন্তু অকপট হয়। এদেরকে দিয়ে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে কোন অপকর্ম করানো যায়না। এদের কাছে মানবতার মুক্তি সর্বাগ্রে বিবেচ্য। সংশয়বাদীগণ অধিক কর্মপ্রবণও বটে। আধুনিক শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে সংশয়বাদীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সংশয়বাদীগণ সমাজের চোখে অন্যরকম হীন প্রমাণিত হবার আশঙ্কায় প্রায়ই নিজেদেরকে সংশয়বাদী বলে পরিচয় দিতে চায় না। বরং তারা ‘নন-প্রাকটিজিং থিস্ট’ বা ‘উপাসনাবিহীন আস্তিক’ বলেই নিজেদের পরিচয় দান করে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক আস্তিকই যে নিয়মিত উপাসনার বাহ্যিক আচরণাদি পালন করে না তাদের বড় একটা অংশ আসলে সংশয়বাদী। নইলে সে যদি আস্তিক হতো, তাহলে উপাসনার বাহ্যিক আচরণাদি পালন না করাহেতু অনন্তকাল পরকালে শাস্তি পাবার ঝুঁকি সে কেন নিবে?