নৈতিক শিক্ষা ও আইনের অনুশাসন

বর্তমানে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন, উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন, নিয়মিত ধর্ষণ, শিক্ষাগুরুর দ্বারাও বলাৎকার, সর্বত্র ঘুষ, দুর্নীতি, দুর্বৃত্ততা, খাদ্যে বিষ মেশানো ইত্যাদির আধিক্য লক্ষ্য করে এদেশের মানবের নৈতিকতাবোধ ও আইনের শাসন প্রায় শুণ্যে গিয়ে ঠেকেছে দেখে অনেক সমাজবিদ, মনোবিদ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি এদেশের পাঠ্যপুস্তকে নৈতিক শিক্ষা প্রবর্তনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করলেও সেটাকে যথেষ্ট বলে মনে করছেন না। বরং পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি হতে সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা ও মানবীয় গুণাবলীর অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করাটাকেই তারা উচিত বলে মনে করছেন। এখন নাকি সেই সময় এসে গিয়েছে যেখানে সন্তানের নৈতিক শিক্ষার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে পরিবার, বিদ্যালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে। এতদিন কি সেটা গুরুত্বহীন ছিল? যদি নৈতিক শিক্ষা প্রদান করাটা পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া না হয়ে থাকে, সেটার কারণ কি?

প্রথমত, বক্তব্য এই যে, নৈতিক শিক্ষা এবং মানবীয় গুণাবলীর অর্জন ও বিকাশের শিক্ষা স্থান ও কাল নিরপেক্ষ। অর্থাৎ ব্যাপারটা এমন নয় যে, যেসব দেশে জনগণ ঘুষ খায়না, দুর্নীতি, দুর্বৃত্ততা করেনা, আইনের শাসন বিদ্যমান, সেসব দেশে এখন বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা ও মানবীয় গুণাবলী বিকাশের শিক্ষা দেয়াটা ততটা প্রয়োজনীয় নয় যতটা প্রয়োজন এখন আমাদের দেশে। বর্তমান প্রজন্ম ভবিষ্যত প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম আইনের শাসনের বিন্দুমাত্র শৈথিল্যেও অনৈতিক হয়ে যাবে। অর্থাৎ নৈতিক শিক্ষা স্থান ও কাল নিরপেক্ষ। যে অশীতিপর শিক্ষক শিক্ষাস্থানে তার ছাত্র বা ছাত্রীকে ধর্ষণ করে, কন্যাসম তো বটেই, নাতনীসম বালিকাকে ধর্ষণ করে, বুঝতে হবে, তার নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। হয়, সে তার পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি থেকে নৈতিক শিক্ষা পায়নি বা পেলেও সেটা নৈষ্ঠিক ও বলবান শিক্ষা নয়, অথবা সে নৈতিক শিক্ষাকে জীবনে সর্বদা আঁকড়ে থাকতে পারেনি। কারণ নৈতিক শিক্ষা শুধু বিদ্যালয় ও পরিবার হতে নৈতিক উপদেশ লাভের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায়না। বরং কর্মক্ষেত্র ও কালের অতিক্রমের সাথে সাথেই নৈতিক শিক্ষা প্রয়োগের ক্ষণ উপস্থিত হয়। ছাত্রজীবনে মানবকে খুব বেশি একটা নৈতিক পরীক্ষা দিতে হয়না। তখন শুধু তাত্ত্বিকভাবে নৈতিক শিক্ষা করতে হয়। প্রকৃত নৈতিক শিক্ষার পরীক্ষা দিতে হয় কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যবহারিক জীবনে যখন অনৈতিক হবার হাজারো প্রলোভন এসে হাজির হয়। তখন যদি মানব নিজেকে সেসব প্রলোভনের ফাঁদ হতে রক্ষা করতে পারে, সেটার মধ্যেই প্রকৃত নৈতিক শিক্ষার পরিচয় মেলে। আর এই যে প্রলোভনের পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হওয়া, এটার জন্যও যথাযথ প্রস্তুতি ও সংগ্রামের জন্যও শিক্ষা করতে হয়। তাই নৈতিক শিক্ষার শিক্ষাগ্রহণের কাল আমরণ। এদিক দিয়েও আরেকবার প্রমাণিত হলো যে, নৈতিক শিক্ষা দান ও গ্রহণ শুধুমাত্র সামষ্টিক জীবনেই নয়, ব্যষ্টিক জীবনেও কাল নিরপেক্ষ। জীবনের যে কোন মুহূর্তেই নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ ও প্রয়োগ করতে হয়।

দ্বিতীয় বক্তব্য এই যে, প্রশ্ন উঠবে, নৈতিক শিক্ষা যারা দিবে, তারা যথেষ্ট নৈতিক কিনা এবং তারা জীবনে পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় গুরু বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে সে শিক্ষা এবং উদাহরণ পেয়েছে কিনা। যে ব্যক্তি অপরের কাছ থেকে নৈতিকতার শিক্ষা লাভ করেনি, নিজে থেকে শতভাগ নৈতিক হওয়া তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। মহাপুরুষ ছাড়া এধরণের নৈতিক ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। জগতে মহাপুরুষ বিরল। তাই এধরণের নৈতিক ব্যক্তিও বিরল ও ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারেনা। মানব অপরের কাছ থেকে উপদেশের মাধ্যমে যতটুকু শেখে, অপরের ব্যবহার ও কর্ম দেখে তার চেয়ে বহুগুণ শেখে। বরং উপদেশদাতার উপদেশের সাথে তার কর্মের বৈসাদৃশ্য দেখলে মানব উপদেশদাতাকে সম্মান তো করেই না, উপদেশদাতার উপদেশকেও সে গ্রহণ করেনা। তাই উপদেশ দাতাকে অবশ্যই সর্বাগ্রে শুদ্ধ হতে হয়। যদিও সমাজের নিকৃষ্টতম মানুষটিও কোন সদুপদেশ দিলে সেটা গ্রহণ করাই যৌক্তিক, কিন্তু নিকৃষ্টতম ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া সদুপদেশ গ্রহণ করার মতো সংবেদনশীল ব্যক্তি সমাজে অত্যল্প। অশীতিপর বৃদ্ধ তার ছাত্রছাত্রীকে বলাৎকার করলে সে পরবর্তীতে তার ছাত্রছাত্রীদের বলাৎকার না করার নৈতিক শিক্ষা দিলে তার সেই শিক্ষা কয়জন শিক্ষার্থীকে স্পর্শ করবে, কয়জনই বা সে শিক্ষা গ্রহণ করবে? ঘরেই যদি ঘুষখোর পিতা থাকে তাহলে সে পিতা তার সন্তানকে ঘুষখোর না হতে উপদেশ দিতে পারে কি? আর ঘুষখোর পিতা সন্তানকে ঘুষ না খেতে উপদেশ দিলেও সন্তান সেটা গ্রহণ করতে পারে কি? বর্তমানে আমাদের দেশে অধিকাংশ পিতামাতা চায়, তাদের সন্তান যেন একেকটা টাকা উপার্জনের যন্ত্র হোক। এবার সন্তান সে অর্থোপার্জন বৈধ বা অবৈধ যেভাবেই করুক, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। সেজন্য অধিকাংশ পিতামাতা সন্তানকে পরিবার থেকে নৈতিকতার শিক্ষাই দেয়না!

নৈতিক শিক্ষা এবং আইনের শাসন একে অপরের পরিপুরক। যখন আইনের শাসন থাকেনা, তখন মানুষ অনৈতিক হয়েও সেটার শাস্তিগ্রহণ হতে মুক্তিলাভ করে। ফলে সে পরবর্তীতে অধিকতর অনৈতিক হতে উৎসাহী হয়। সম্প্রতি প্রকাশ্য দিবালোকে যে খুনি রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করেছে, সে পূর্বেও অনেক অপরাধ করেছে কিন্তু সেজন্য সে শাস্তি পায়নি। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেই খুনী যে অতীতে অনেক অপরাধ করেছে সেটা সম্পর্কে এতটা নিশ্চিত হবার কারণ কি? এটার পিছনে আছে অপরাধবিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত। অপরাধবিজ্ঞানের মতে, কোন মানবই হঠৎ করেই অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ করে ফেলতে পারেনা। তাকে প্রথমে ছোট ছোট অপরাধ করে ক্রমাগত তার পাশবিক চেতনাকে বড় হতে বড়তর অপরাধ করার নিকৃষ্ট স্তরে অবনমন করতে হয়। তাই নিকৃষ্টতম অপরাধ, হত্যা করার আগে সে যে বহুতর ছোটবড় অপরাধ করেছে এবং সেজন্য আইন তাকে শাস্তি দেয়নি, সেটা বলাই বাহুল্য। কারণ অপরাধের শাস্তি পেলে অপরাধীর কিছুটা হলেও সংশোধন হয়, আর অপরাধের শাস্তি না পেলে অপরাধী বহুগুণ গতিতে বহুগুণ ভয়ঙ্কর অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়।সংবাদে প্রকাশিত, এই হত্যাকারীই কিছুদিন আগে হাসপাতালে চিকিৎসকের উপর হামলা করেছিল, সমাজের মানুষ তাতে মনে মনে খুশিও হয়েছিল, আইনও তাকে জেলে পুরতে পারেনি। কারণ সে স্থানীয় রাজনীতিবিদের ভায়রা। পূর্বের অপরাধের জন্য সে যদি অন্তত জেলে থাকতো, তাহলে রিফাতকে এভাবে মরতে হতো না।

উন্নত বিশ্বে মানব যে সহজে অনৈতিক হতে পারেনা, অন্যায় করেনা, ঘুষ খায়না, দুর্বৃত্ত হয়না, সেটার কারণ নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ। তাই শুধু নৈতিক শিক্ষাই অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট নয়, আইনের শাসনও অতি জরুরী। কারণ মানবের প্রবৃত্তি শুদ্ধতম না হওয়া পর্যন্ত তার দ্বারা বিন্দুমাত্র অনৈতিক কাজ হবার সম্ভাবনা থেকেই যায়। কিন্তু আইনের সুশাসনের ভয়ে তখন মানব সহজে অপরাধ করতে পারেনা। তখন অপরাধ না করতে করতে মানবের মধ্যে অপরাধ না করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। আবার শুধু মাত্র আইনের শাসনও অপরাধ দমন করতে পারেনা, নৈতিক শিক্ষারও প্রয়োজন আছে। যে সমাজে অধিকাংশ মানব নৈতিক, অল্প সংখ্যক মানব অনৈতিক ও দুর্বৃত্ত, আইনের শাসন সেখানেই কার্য্যকর হয়। কিন্তু যে সমাজে অধিকাংশ মানব অনৈতিক ও দুর্বৃত্ত, অল্প সংখ্যক মানব দুর্বৃত্ত, সেখানে আইনের শাসনের প্রশ্নই ওঠেনা। কারণ, প্রথমত, সমাজের সেই অধিকাংশ অনৈতিক এবং দুর্বৃত্ত সদস্যের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সদস্যও বিদ্যমান। তাহলে কে, কার বিচার করবে?! দ্বিতীয়ত, সমাজের সর্বত্র অনৈতিকতা ও দুর্বৃত্ততা থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অসহায় হয়ে পড়ে। কারণ রাষ্ট্রের পক্ষে ঘরে ঘরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা অসম্ভব। তাই নৈতিক শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রয়োজন এ যুক্তিতেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *