জগতে কে মহীয়ান, কর্ম নাকি কর্মফল?

সাকিব আল হাসান সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “ভালো খেলে কোন লাভ নেই যদি জয়টাই না আসে”। আসলেই কি তাই? তাহলে এতদিন যে শুনে এসেছি, “জয়-পরাজয় মুখ্য নয়, অংশগ্রহণই বড় কথা”, এটা কি ভুল? এটাতো ক্রীড়াক্ষেত্রের কথা হলো। বাস্তবজীবনেও কি বলবো যে, কর্ম করে কোন লাভ নেই, কর্ম অর্থহীন যদি সাফল্যটাই না আসে?

জগতে জয়-পরাজয়, সাফল্য-ব্যর্থতাকে তুল্য ভাবার মতো উচ্চ চেতনার মানব খুবই কম আছে। সুখের আশা যেমন কামনা, দুঃখ থেকে দুরে থাকার আশাও কামনাই। আর কামনাই মানবের সকল দুখের মূল। সাফল্য-ব্যর্থতা সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। মানব শুধু ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও সর্বোচ্চ চেষ্টা দ্বারা তার কর্তব্যকর্মটুকু করে যাবে নিষ্কামচিত্তে এবং কর্মের ফল হিসেবে সাফল্য-ব্যর্থতা যাই আসুক, তাতেই সে সমান ভাব বজায় রাখবে। কারণ মানবের হাতে শুধু কর্মটুকুই আছে, কর্মের ফল মানবের হাতে নয়, বিধাতার হাতে।

এটা উচ্চচেতনার জীবনদর্শনের কথা যেখানে ব্যর্থতার জন্য নিয়তিকে দোষারোপ করা হয়না বরং শান্ত চিত্তে মেনে নেয়া হয়। অথচ কর্ম করার প্রকৃত উপায়ও সেখানে বিবৃত হয়েছে কারণ নিষ্ঠা এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা সেখানে করতে বলা হয়েছে। বস্তুত ব্যর্থতা মানবকে ততটা দুঃখ দেয়না, যতটা দুঃখ আসে ব্যর্থতা মেনে নিতে না পারাতে। আর সকল কর্ম সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও চেষ্টার দ্বারা সম্পাদন করে কর্মফল বিধাতাকে সমর্পণ করলে তাতে মানব শুধু সুখ-দুখে সমজ্ঞানীই হয়না, অন্তরেও সর্বোচ্চ শান্তি লাভ করে। আর সুখের চেয়ে যেমন শান্তি বড়, তেমনই কর্মফলের চেয়েও কর্ম মহীয়ান। কারণ কর্ম বিনা কর্মফল প্রাপ্তি হতে পারেনা। কর্ম কর্মফলের আধার, কর্মফল কর্মের আধেয়। আধার সর্বদাই আধেয়ের চেয়ে মহান হয়। এই যুক্তিতেও কর্মফলের চেয়ে কর্ম মহান।

অনেকে হয়তো বলবে, কর্ম এবং কর্মফলের মধ্যে একটা ব্যালেন্স বা সমতা থাকা উচিত। নইলে ক্রমাগত ভাগ্যবঞ্চিত হতে থাকলে মানব কর্ম করাতেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বে। প্রকৃতপক্ষে মানবের উৎসাহ এবং লক্ষ্যটা কর্তব্যকর্মের প্রতিই হওয়া উচিত, কর্মফলের প্রতি নয়। মানব কর্তব্যকর্মের পরিবর্তে বা কর্তব্যকর্মের পাশাপাশি বা কর্তব্যকর্মের চেয়ে কর্মফলের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয় বলেই মানব কর্ম করে আশানুরূপ ফল না পেলে দুখের সাগরে ভেসে যায়। কিন্তু মানব যদি কর্তব্যকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাতেই আনন্দ নির্ধারণ করতো বা সেটাকেই লক্ষ্য করতো, তাহলে সে তার কর্তব্যকর্ম সর্বদা পালন করেই সদানন্দে থাকতো, কর্মফল যেরকমই আসুক, সেটা তার আনন্দকে কখনোই বিঘ্নিত করতে পারতো না। আবার এই ব্যালেন্স মানবের হাতে নেই, মানবের হাতে শুধু কর্মটুকুই আছে, কর্মফল নয়। বস্তুত মানবের অধিকারটুকুও এই কর্মেই, কর্মফলে নয়। তাই মানবকে তার কর্তব্যকর্মটুকু নিষ্ঠার সাথে পালন করতেই হবে, তাতে সাফল্য বা ব্যর্থতা যাই আসুক না কেন। এই যে সাকিব ভালো খেলেও জয় পেলনা, সেজন্য কি সাকিবের এই ভালো খেলা অর্থহীন? সাকিব কি এখন কর্তব্যকর্ম ত্যাগ করবে অর্থাৎ ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিবে? নাকি সাকিব এই জয়হীনতা মেনে নিয়েই কর্তব্যকর্ম চালিয়ে যাবে? সাকিব যদি এই জয়হীনতা মেনে নিতে না পারে, তাহলে সে পরবর্তীতে কর্তব্যকর্ম করার সময় অর্থাৎ ম্যাচ খেলার সময় এই জয়হীনতা মেনে নিতে না পারাটাই মোহ হিসেবে উপস্থিত হবে যা তার স্বাভাবিক পারফর্মেন্সকে অবশ্যই বাধাগ্রস্ত করবে। তাই কর্মফল যেরকমই আসুক, সেটাকে মেনে নিয়ে শতভাগ নিষ্ঠার সাথে কর্তব্যকর্ম করে যাওয়াই জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান কর্মীর লক্ষণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *