সিলেটে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকা কিছু রেলসেতুতে এতদিন ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটার পরেও যখন সেসব মেরামত করেনি রেল রক্ষণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ, তখন থেকেই অনেক সাধারণ যাত্রীই একটা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করেছিলেন, শুধুমাত্র রেল কর্তৃপক্ষ বাদে। তারা যথেষ্ট উচ্চমাত্রার যোগ্যতাসম্পন্ন বলে তারা এসবে কোন দুর্ঘটনার ঝুঁকি খুঁজে পায়নি। আর যদি পেয়েও থাকে, সেসব ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু মেরামত না করার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? সম্ভবত কয়েকটা রেলসেতু মেরামতে সামান্য বরাদ্দ বাজেট থেকে খুব বেশি টাকা লোপাট করা যাবেনা। তাই সেসব ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটা রেলসেতু মেরামত করাতে রেল কর্তৃপক্ষ বোধ করি, খুব বেশি একটা আগ্রহ দেখায়নি। নইলে অনেক আগেই সেসব সেতু মেরামত করে ফেলতো রেল কর্তৃপক্ষ। কারণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে ১৫ টা ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইজারা নিয়ে যেখানে মাসিক লাভ থেকে মাসে সরকারকে ১৮ কোটি দেয়, সেখানে রেললাইন কর্তৃপক্ষের ১০০ ট্রেনে বছরে ৩০০ কোটি টাকা লোকসান হয়! অতএব এই সীমাহীন দুর্নীতির তুলনায় মাত্র কয়েকটা ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর বাজেট হতে দুর্নীতির পরিমাণ অতি নস্যিই হওয়ার কথা। সেজন্যই রেল কর্তৃপক্ষের কাছে সেসব ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু মেরামতে কোন আগ্রহই ছিল না হয়তো। অবশ্য বছরদুয়েক আগে যাও যৎসামান্য রেলসেতু সংস্কার করা হয়েছিলো সেখানেও লোহা বা শক্ত কাঠের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছিলো! সে দুর্বৃত্ততা, দুর্নীতি জাতীয় পত্রিকাগুলোতেও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তাতে করতৃপক্ষের টনক নড়েনি, চোর এবং চাটার দল সেসব সংবাদ-টংবাদে পাত্তাই দেয়নি। এভাবেই চোর এবং চাটার গোষ্ঠী দেশকে সর্বক্ষেত্রে বাঁশ দিয়ে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে রেলমন্ত্রী রেলদুর্ঘটনার কারণ হিসেবে রেলযাত্রীদের তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে ওঠাকে দায়ী করেছেন! রেলসেতুগুলো যে ঝুঁকিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও সেসবকে মেরামত করেননি, বছর দুয়েক আগে রেললাইনে লোহা বা শক্ত কাঠের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে জাতিকে বাঁশ দেবার কথা বেমালুম চেপে গেলেন! কি বলিহারি একটা ব্যাপার, তাই না?

এই যে কুলাউড়া রেল দুর্ঘটনায় ২১ জনের প্রাণহানি এবং কমপক্ষে ২৫০ জনের আহত হবার ঘটনা ঘটলো, এজন্য কি রেলকর্তৃপক্ষ, রেলমন্ত্রনালয়ের অবহেলা দায়ী নয়? কয়েক বছর আগে ইরফান খান অভিনীত ‘Madari’ চলচ্চিত্রটিতে একইরকম দুর্ঘটনা নিয়ে কাহিনীবিন্যাসে সড়ক মন্ত্রণালয় এবং সড়ক মন্ত্রী, দুর্বৃত্ত সড়ক প্রকৌশলী এবং দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারকে একেবারে চিড়ে ফেলা হয়েছিলো। এক্ষেত্রেও কি তেমনটা হবে বাস্তবে? নাকি তেমনটা হওয়া উচিত নয় এদেশে? সভ্য দেশে এমনটা হলে এতক্ষণে পদত্যাগের হিড়িক পড়ে যেতো, গ্রেফতারও হতো অনেকে। কিন্তু অসভ্য দেশে তেমনটা হয়না। কদিন আগে নড়াইলে দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরকারি হাসপাতালে একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাকে স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ জনপ্রতিনিধি যেভাবে হম্বিতম্বি করেছিলেন ও তড়িৎ শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন তাতে দেশে ধন্য ধন্য রব পড়ে গিয়েছিলো। সেই কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্যের উক্তি, “আপনাকে আমি এখন কি করবো? আপনি কি আমার সাথে ফাইজলামী করেন?” জাতীয় বীরোক্তি বলে নির্বাচিত হয়েছিলো। অবশ্য সেখানে কোন প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু এখন যে রেলসেতু ভেঙে এতগুলো হতাহতের ঘটনা ঘটলো, এখন কে, কাকে বলবে, “আপনাকে আমি এখন কি করবো? আপনি কি আমার সাথে ফাইজলামী করেন?” রেল কর্তৃপক্ষ, রেল মন্ত্রণালয়, রেলমন্ত্রী বা রেলসচিবকে উপরোক্ত প্রশ্ন করার হেডাম এদেশে উপরোক্ত জনপ্রতিনিধি বা অন্য কারো আছে কি?

আজ দেশের কোন এক প্রতিষ্ঠানে দেশের এক সংসদ সদস্যের কোন একটা অনুষ্ঠানের শুরুতে উপরোক্ত রেলদুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের সংবাদ শুনে একজন নাগরিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই নীরবতা পালনেই সব দায়িত্ব-কর্তব্য শেষ কিনা। উত্তরে আমি বলেছিলাম, সম্ভবত এখানেই শেষ নয়। যারা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ব্যর্থ, তাদের পদোন্নতির পরেই দায়িত্ব-কর্তব্য, যথাযথ ব্যবস্থাগ্রহণ শেষ হবে। জানিনা সঠিক বলেছি কিনা। ভুল বললে ক্ষমাপ্রার্থী। এমনটা মনে হবার কারণ দেশের অত্যধিক জনসংখ্যা। দেশের মানুষকে তো আর মাথায় গুলি করে সরাসরি মেরে ফেলে জনসংখ্যা কমানো যায়না। সেটা বড্ড দৃষ্টিকটু এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। তাই জনসংখ্যার বড় একটা অংশকে যদি ভেজাল খাবার খাইয়ে, ভেজাল ঔষধ খাইয়ে অপচিকিৎসা দ্বারা ধীরে ধীরে আয়ু কমিয়ে অকালে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া যায়, নিয়মিত নৌ, সড়ক, বিমান ও রেল দুর্ঘটনা, আগুনে পুড়ে মৃত্যু ইত্যাদি দ্বারা কিছু মানুষকে মেরে ফেলা যায় তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্র হয়তো কিছুটা জনসংখ্যার ভার হতে মুক্ত হতে পারে! সেজন্যই বোধ করি, এদেশে দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সেটার জন্য আগাম কোন প্রস্তুতি খুব বেশি একটা নেয়া হয় না।